
শফিকুল ইসলাম :: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ, উৎমা ছড়া, কালাইরাগ, শাহ আরফিন এলাকা, পাশাপাশি জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাঁট অঞ্চলের পাথর কোয়ারিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় স্থানীয় অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবারে তিনবেলা খাবার জুটছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জীবিকার তাগিদে সীমান্তবর্তী অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করছেন। এ সময় খাসিয়াদের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে, এমনকি নিহতদের মরদেহও অনেক ক্ষেত্রে ফিরে পাচ্ছে না পরিবার। একই সঙ্গে কর্মহীনতার কারণে তরুণ সমাজের একটি অংশ মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকছে এবং দারিদ্র্যের কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু-কিশোর শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ব্যাংক ঋণে কেনা যানবাহনের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় অনেক মালিক মামলার মুখে পড়ছেন। প্রায় ৪০০-এর বেশি পাথর ভাঙার মিল-কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে, ফলে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র মতে, কোয়ারিগুলো চালু থাকলে শুধুমাত্র ট্রাক খাত থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব ছিল। এছাড়া ইজারা দেওয়া কোয়ারি থেকে বছরে সাড়ে ৭ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ উত্তোলনের কারণে সরকার সেই আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রায় ৮ থেকে ৯ বছর ধরে কোয়ারি বন্ধ থাকায় ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি ও জাফলং এলাকার ১০ থেকে ১১ লাখের বেশি শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট মানুষ জীবিকা সংকটে পড়েছেন। একসময় পাথর উত্তোলনকেই কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের অর্থনীতি এখন ভাটার মুখে।
সম্প্রতি কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনাও পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। গত ১ এপ্রিল উত্তর রণীখাই ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় সাদ্দাম হোসেন (৩০), ৯ এপ্রিল দয়ারবাজার এলাকায় সালেহ আহমেদ জয়ধর (৩০), ১৩ এপ্রিল ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকায় ফয়জুর রহমান (২৭) এবং কলাবাড়িতে ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় সুহান (২৩) নিহত হন।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, কোয়ারি নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে চালু থাকলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়ানোর প্রবণতা কমে যেত। তাদের ভাষ্য, বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের একটি অংশ পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে ‘সনাতন পদ্ধতিতে’ সীমিত পরিসরে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে তারা মনে করেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
এলাকাবাসীর মতে, দীর্ঘদিন কোয়ারি বন্ধ থাকায় সরকার সম্ভাব্য বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের দাবি, সঠিক তদারকি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে কোয়ারিগুলো চালু করা হলে সরকার বিপুল রাজস্ব আয় করতে পারত, যা বর্তমানে বিদেশি পাথর আমদানির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।
পাথর কোয়ারি এলাকার বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থানীয়রা একটি বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট হিসেবে দেখছেন। তারা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত একটি সমন্বিত ও টেকসই সমাধানের উদ্যোগ নেবে।