
এখন সিলেট ডেস্ক :: সিলেটের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র সুলতানে সিলহেট হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর ভাগ্নে হযরত শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ দীর্ঘ সাত শতাব্দী ধরে একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ধর্মীয় আবেগ ও সরলতাকে পুঁজি করে কিছু সুবিধাভোগী বংশানুক্রমিকভাবে দর্শনার্থীদের মান্নত, নজর, দান-সাদকাসহ বিভিন্ন আয়—যা বছরে লক্ষ লক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকায় দাঁড়ায়—কোনো স্বচ্ছ হিসাবব্যবস্থা ছাড়াই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে ভোগ করে আসছিলেন। এছাড়া দরগাহ সংলগ্ন স্থাপনা ও সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয়ও প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে রাখা হতো।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদন ও পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে সিলেটের জেলা প্রশাসক জনাব সারওয়ার আলম ১০ জুন সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করেন। সভায় দরগাহ দুটির পরিচালনা কমিটি, সংশ্লিষ্ট মাদরাসা ও মসজিদের পর্ষদ, মোতাওয়াল্লী ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত নথিপত্র ও ব্যবস্থাপনার বিবরণ উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জনাব মাসুদ রানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সিলেট জেলা ও মহানগর নেতৃবৃন্দ, ওয়াকফ প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিচালনা কমিটি দীর্ঘদিনের আয়-ব্যয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট রেকর্ড উপস্থাপন করতে পারেননি।
জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নন—তাঁরা সমগ্র সিলেটবাসীর গর্ব ও ঐতিহ্য। তাঁরা এ অঞ্চলে এসেছিলেন একত্ববাদের আহ্বান নিয়ে, অন্যায় ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মানুষকে সঠিক জ্ঞান ও মানবিকতার পথ দেখাতে। তাই তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক কল্যাণ ও জনসাধারণের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা অপরিহার্য।
তিনি কঠোর নির্দেশনা দেন যে, এখন থেকে দরগাহের সকল আয় ও ব্যয় স্বচ্ছভাবে নথিভুক্ত করতে হবে এবং নিয়মিত প্রশাসনের নিকট প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতি সপ্তাহে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক দর্শনার্থী এখানে আসেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, পার্কিং ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার তীব্র অভাব রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি একটি ব্যাপক মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন: দরগাহ সংলগ্ন মসজিদকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বহুতলবিশিষ্ট নান্দনিক ভবনে রূপান্তর করা হবে, যেখানে নারী দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মাদরাসাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষা-গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং এর গ্রন্থাগারকে বিরল পুস্তক ও জ্ঞানের ভান্ডারে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগকে উপস্থিত সকলে স্বাগত জানান। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দরগাহকে প্রকৃত অর্থে ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।