নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলার অন্যতম প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.)-এর জীবন, আধ্যাত্মিক ধারা, সিলেটে ইসলাম প্রচার এবং পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনের সঙ্গে তাঁর মানহাজের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিমের একটি গবেষণাধর্মী লেখায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ, শিলালিপি ও জীবনীগ্রন্থের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সিলেটে ইসলামের বিস্তারের ইতিহাসে শাহজালাল (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সিলেটের শাহজালালের দরগাহে সংরক্ষিত ৯১৮ হিজরি/১৫১২ খ্রিস্টাব্দের একটি ফারসি শিলালিপিতে ৭০৩ হিজরি/১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট বিজয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে শেখ জালাল ইবনে মুহাম্মদের স্মৃতির কথাও বলা হয়েছে।
তবে গবেষকদের মধ্যে শাহজালালের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়, তাঁর জন্মস্থান ও আধ্যাত্মিক সিলসিলা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। পরবর্তী জীবনীগ্রন্থ গুলজার-ই-আবরার-এ তাঁকে তুর্কিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সৈয়দ আহমদ ইয়াসাবির আধ্যাত্মিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম. ইটনের গবেষণাতেও উল্লেখ রয়েছে যে শাহজালালের প্রাথমিক জীবনের বর্ণনা তাঁর জীবদ্দশার কয়েক শতাব্দী পর রচিত হagiographical বা জীবনীমূলক সূত্রে পাওয়া যায়।
শাহজালালের আধ্যাত্মিক ধারা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও সিলেট অঞ্চলে তাঁর প্রভাব এবং সুফি-দরবেশদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের বিষয়টি ঐতিহাসিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা সিলেটে এসে শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে শাহজালালকে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী সুফি সাধক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাঁর কাছে বহু মানুষ আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার জন্য আসতেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনের ইতিহাস প্রসঙ্গে লেখক ইরবিলের শাসক মুজাফফরুদ্দিন গোকবুরি (কুকুবুরি)-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। ঐতিহাসিকভাবে গোকবুরি ইরবিলের শাসক এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে ইরবিলে তাঁর উদ্যোগে বৃহৎ পরিসরে মিলাদুন্নবী আয়োজনের ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে শাহজালাল (রহ.) সরাসরি গোকবুরির দরবারে অবস্থান করেছিলেন এবং তাঁর মাধ্যমে মিলাদুন্নবী উদযাপনের রীতি গ্রহণ করেছিলেন—এ দাবির পক্ষে সমসাময়িক ও স্বাধীন ঐতিহাসিক সূত্রের শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে বিষয়টি গবেষণামূলক আলোচনায় দাবি বা ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করাই অধিকতর সতর্ক পদ্ধতি।
ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে কোরআনের ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আনন্দ করার’ নির্দেশ এবং মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন উপলক্ষে সোমবার রোজা রাখার হাদিসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন লেখক। একই সঙ্গে পরবর্তী যুগের একাধিক আলেম ও সুফি সাধকের মিলাদুন্নবী উদযাপনের দৃষ্টান্তও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে মহানবী (সা.)-এর মদিনায় আগমনকে ১২ রবিউল আউয়ালের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে সেটিকে মিলাদুন্নবীর প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টি নিয়েও ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। তাই এ বিষয়ে বিভিন্ন মতকে আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবন ও কর্ম দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামী ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর সিলসিলা, আধ্যাত্মিক মানহাজ এবং মিলাদুন্নবী বিষয়ে অবস্থান নিয়ে প্রচলিত বর্ণনার পাশাপাশি প্রাথমিক ও সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎস বিশ্লেষণ জরুরি। গবেষকরা মনে করেন, শাহজালালের জীবনীতে পরবর্তী সময়ে রচিত সুফি-জীবনীগ্রন্থের প্রভাব থাকায় কিংবদন্তি, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণ—এই তিনটি বিষয় পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিম তাঁর লেখায় দাবি করেছেন, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবনধারা ও তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুফি ঐতিহ্য ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত বহন করে। তবে এই দাবির চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সত্যতা নির্ধারণে আরও প্রাথমিক দলিল ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
আইনে আকবরী; দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর হজরত শাহজালাল (র.) দলিল ও ভাষ্য; এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিমের শাইখুল মাশাইখ হযরত শাহ্ জালাল মুজাররদ রহ.; ইবনে হিশাম ও ইবনে ইসহাকের সিরাত; ইবনে কাসীরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; ইবনে বতুতার রিহলা এবং রিচার্ড এম. ইটনের The Rise of Islam and the Bengal Frontier।