সুনির্মল সেন :: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।এই গোলামীর চুক্তি সম্পাদনে খলিলুর রহমানসহ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের যারা যুক্ত ছিল তাদের বিচার করতে হবে।
গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দরা উপরোক্ত কথা বলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার দাবিতে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের উদ্যোগে সোমবার (১৬ মার্চ ২০২৬) বিকেল সাড়ে তিনটায় ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সমাবেশে অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের আমলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পাদিত বৈষম্যমূলক ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী 'রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট' (ART) বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে এবং এই চুক্তির মূল হোতা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের অবিলম্বে অপসারণ দাবি করা হয়েছে।
সমাবেশে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের নেত্যৃবৃন্দ বলেন, একটি সত্যিকারের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দুটি পক্ষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করে। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে 'Bangladesh shall' বাক্যাংশটি ১৫৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে, আর 'United States shall' মাত্র ৯ বার। এটিই প্রমাণ করে এই চুক্তি কার স্বার্থে তৈরি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে মার্কিন ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে, যেখানে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা। CPD-এর হিসাবে এর ফলে বাংলাদেশ বার্ষিক ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি-শুল্ক রাজস্ব হারাবে। এর বিনিময়ে যে 'সুবিধা' দেওয়া হয়েছে তা নেহাতই নামমাত্র—মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপর রেসিপ্রোকাল শুল্ক ৩৭% থেকে কমিয়ে মাত্র ১৯% করা হয়েছে এবং বিদ্যমান ১৫.৫% শুল্ক মিলিয়ে মোট কার্যকর শুল্কের বোঝা দাঁড়ায় ৩৪.৫%-এ।
এই চুক্তি বাংলাদেশকে আন্তর্জতিক বাজার থেকে সস্তায় পণ্য কেনার স্বাধীনতা হরণ করে মার্কিন পণ্য বেশি দামে কিনতে বাধ্য করবে। গম, তুলা, রাসায়নিক ও শিল্প পণ্য, এলএনজি, প্রতিরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী মার্কিনীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, নির্বাচনের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই চুক্তির অর্থ বাংলাদেশকে ১০ থেকে ২০ বছর ধরে প্রতি বছর ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা কিস্তি দিতে হবে — যা জনগণের উপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে সব কিছু ঠিক থাকলেও ১৪টির মধ্যে প্রথম বিমানটিও আসবে ২০৩১ সালের অক্টোবরের পর। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় চুক্তি করা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি একটি কৌশলগত অধীনতার দলিল। চুক্তির ৪.১ ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকে 'পরিপূরক বিধিনিষেধ' গ্রহণ করতে হবে। এর অর্থ হলো, আমেরিকা চীন বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকেও তাতে যোগ দিতে বাধ্য করা যাবে—বাংলাদেশের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
এছাড়া চুক্তির ৫.২ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না যা মার্কিন স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে। ৪.৩(৪) ধারায় বলা আছে, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার সাথে কোনো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করে যা এই চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় দণ্ডমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এর মানে হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি এখন ওয়াশিংটনের ভেটো-ক্ষমতার অধীনে চলে যাবে।
এই ধ্বংসাত্মক চুক্তির নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। চুক্তি সম্পাদনে তাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে সক্রিয় ও তৎপর। এই একই ব্যক্তিকে বিএনপি সরকার তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে—এটি জনগণের সাথে একটি নিষ্ঠুর প্রহসন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর খলিলুর রহমান নির্লজ্জভাবে ঘোষণা দিয়েছেন—'এটি খুব ভালো চুক্তি' এবং 'দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে চুক্তি হয়নি।' তিনি আরও দাবি করেছেন যে, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলেই এই চুক্তি করা হয়েছে—অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত এই দেশবিক্রির বিষয়ে 'সম্মতি' দিয়েছিল। তাই বিএনপি সরকারকে অবিলম্বে এই চুক্তি বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধির 'কথা বলা' মানে জনগণের সম্মতি নয়। সাংবিধানিক নীতি অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তি সংসদে অনুমোদিত হতে হয়—এই চুক্তিতে তা হয়নি।
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেছে—ট্রাম্প প্রশাসন 'ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (IEEPA)'-এর আওতায় যে ব্যাপক রেসিপ্রোকাল শুল্ক আরোপ করেছিল, তা বেআইনি ও অসাংবিধানিক।
মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী দাতুক সেরি জোহারি আবদুল ঘানি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন—সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিন থেকেই মালয়েশিয়া-মার্কিন 'পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি' অকার্যকর হয়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো—মালয়েশিয়া পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি অনুমোদন স্থগিত রেখেছে, ভারত সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে—এই বাস্তবতায় বিএনপি সরকার কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করে রাখবে? এটি তাদের কথিত 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি